প্রচ্ছদ খোলা কলাম, স্লাইডার

সামরিকতন্ত্রের কালোছায়ার ইতিহাস ও গণতন্ত্রের অন্তরায়

ইমদাদুল হক সরকার | বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭ | পড়া হয়েছে 487 বার

১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্র শাসন করেছে অবৈধ সেনাপতি শাসকরা, কিংবা তাদের হাতে গড়া হঠাৎ গজানো রাজনীতিবিদরা। এ সময়ে বাংলাদেশের মাটিতে এক নতুন পূর্ব পাকিস্তান তৈরির আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হয়েছে। এসব স্বৈরশাসকের হাতে রাষ্ট্রের স্থপতি চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছেন, উপেক্ষিত হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, চেতনা ও আদর্শ। ফলে গজিয়েছে নানা পরগাছা, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি খুঁটি গেড়ে বসেছে, ধনেজনে তারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসবই করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে, যাতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়, ব্যর্থ হয় লক্ষ মানুষের আত্মদানের মুক্তিযুদ্ধ, যে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনী ও তাদের দেশীয় অনুচররা বাঙালী জাতীয়তাবাদী শক্তির কাছে পরাজিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে। নানা পালাবদলের পর ১৯৯০ থেকে রাষ্ট্রের আশা জাগানিয়া গণতান্ত্রিক নবযাত্রা শুরু হয়। কিন্তু সে যাত্রাও মসৃণ হতে পারেনি। ফলে গণতান্ত্রিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রধান কারণ এই যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ডের বিচারের প্রশ্নে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লালনের প্রশ্নে, অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তা সংরক্ষণের প্রশ্নে পরস্পর বিপরীতমুখী অবস্থান গ্রহণ করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। রাষ্ট্রের দুর্ভাগ্য যে, ইতিহাস সংরক্ষণ এবং সত্য ও ন্যায়ের প্রতিপক্ষ হিসেবে এ দেশেরই কিছু রাজনৈতিক দল নিজেদের যুক্ত করেছিল। এরা পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধ শক্তিকে উৎসাহিত ও পুনর্বাসিত করে। সামরিক শাসকদের ছত্রছায়া ও তাদের ধারাবাহিকতায় এরা ক্রমাগতভাবে অস্বীকার করে গেছে বঙ্গবন্ধুকে, সেইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকে, আঘাত হেনেছে সেক্যুলার সমাজশক্তির প্রতিটি স্তরে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই মনোভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্র লাভবান হয়নি, বরং কণ্টকাকীর্ণ হয়েছে, জাতি উত্তরোত্তর বিভাজিত হয়েছে, একের পর এক সঙ্কট গ্রাস করেছে রাষ্ট্রকে। অন্যদিকে দুর্ভাগ্যজনক এই প্রক্রিয়ায় দেশের স্বাধীনতার চিহ্নিত প্রতিপক্ষরা শক্তি সঞ্চয় করেছে। সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গীবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এক সময় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, হয়ত কেউই ভাবতে পারেননি যে, বাংলাদেশের মাটিতে কখনও বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু সেই ভাবনা সত্য প্রমাণিত হয়নি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনকের হত্যাকান্ডের বিচার ঠেকানো সম্ভব হয়নি, এমনকি বিচার ঠেকানো যায়নি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদেরও। দেরিতে হলেও ইতিহাসের অমোঘ সত্যগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ন্যায়বিচারের পথে বাংলাদেশ অনেকখানি অগ্রসর হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের রাজনৈতিক দোসররা নিরন্তর বিষবাষ্প ছড়ালেও নতুন প্রজন্মের বৃৃহৎ অংশ মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসের প্রতি আজ আস্থাশীল। আরও লক্ষ্য করা গেছে যে, নবপ্রজন্মের মানুষ বিকৃত ইতিহাস থেকে বেরিয়ে এসে ন্যায় ও সত্যের পক্ষ নিয়েছে, যা একটি বড় অগ্রগতি রাষ্ট্রের। এই মনোজাগতিক উত্থান ইতিহাসেরই আরেক অমোঘ নবজাগরণ।অন্যদিকে ক্রমাগত আঘাতে দীর্ঘকাল পর্যুদস্ত থাকলেও আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি আগের যে কোন সময়ের চাইতে শক্তিশালী হয়েছে। তারা তাদের বিভেদ ও আত্মতুষ্টির প্রতিক্রিয়া এবং ব্যর্থতা অনুভব করেছে। কাজেই এ শক্তিকে অদূর ভবিষ্যতে দুর্বল করা যাবে ভাবা ঠিক হবে না। বরং দিন যত যাবে ততই মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, অপ্রতিরুদ্ধ হবেনÑ আজ যা তার চাইতেও বেশি। জাতীয় রাজনৈতিক পরিম-লে সে কারণেই একটি গুণগত পরিবর্তন বাঞ্ছনীয়। পুরনো ব্যর্থতা ও কলঙ্ক থেকে বেরিয়ে এসে নতুনের উপলদ্ধিতে সিক্ত হওয়া সে কারণেই বর্তমান সময়ের দাবি। পরিবর্তনের এ প্রার্থিত ধারা জাতীয় রাজনীতিতে সমূহ সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে, জাতীয় ঐক্যের পথে বড় বাধাটি দূর করতে পারে। এ পরিবর্তনের মূল শর্তÑ অতীতের কলঙ্ক ঝেরে ফেলে নিঃশর্তভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রের জনক হিসেবে তাঁর ঐতিহাসিক মহীমায় গ্রহণ করা, তাঁর হত্যাকা-ের নিন্দা জ্ঞাপন করা, মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিকৃত ইতিহাসকে পরিপূর্ণ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের ঐতিহাসিক বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন দান করা। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যে বা যারা এই অতিন্যায্য কাজগুলো করতে ব্যর্থ হবেন, তিনি বা তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রে বিশ্বাসী হতে পারেন না।

Comments

comments

Visitor counter

Visits since 2018

Your IP: 54.221.75.115

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০