প্রচ্ছদ জাতীয়, বিচিত্র নিউজ, শিরোনাম, সংগঠন সংবাদ, সাক্ষাতকার, স্লাইডার

সতীদাহের চেয়ে বাল্যদাহ কম মারাত্মক নয়

নওরীন পল্লবী (নারীবাদী লেখক) | সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | পড়া হয়েছে 214 বার

সতীদাহের চেয়ে বাল্যদাহ কম মারাত্মক নয়

বাল্যবিবাহ বাংলাদেশের অন্যতম একটি সামাজিক সমস্যা এবং আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। মেয়েদের সুস্থ্য স্বাভাবিক জীবনযাপন, স্বনির্ভরতা অর্জন এবং সর্বোপরি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রাখার অন্যতম কারণ বাল্যবিবাহ।

ইউনিসেফের মতে, শিশু যৌন নিপীড়নের সবচেয়ে বড় মাধ্যম ‘বাল্যবিবাহ’। আঠারোর নিচে কোনো ছেলে/মেয়ে নিয়মিত ইন্টারকোর্সের জন্য শারীরিক কিংবা মানসিক কোনোভাবেই উপযুক্ত হয় না। উপযুক্ত হয় না কোনো স্ট্যাবল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারেও। আর বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তো একেবারেই না।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েদেরকে বিয়ের উপযুক্ত ধরে নেওয়া হয় দুটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে।

১) মেয়েটির পিরিয়ড় শুরু হলে।
২) শারীরিকভাবে মনে হলে।

আসলেই কি এই দুটো ফ্যাক্টর কোনো মেয়ের বিয়ের উপযুক্ততার মানদন্ড? বিজ্ঞান কী বলে? বিজ্ঞানের উত্তর হচ্ছে- ‘না’। একটু ব্যাখ্যা করা যাক।

১) পিরিয়ড় হওয়া কি বিয়ের উপযুক্ততা নির্দেশ করে?

সাধারণত মেয়েদের পিরিয়ড শুরু হয় ১৩/১৪ বছর বয়সে। যেহেতু পিরিয়ড শুরু হওয়া সাথে সন্তান জন্মদানের সক্ষমতা জড়িত, আমরা ধরে নিই এটা বিয়েরও সক্ষমতা। ধারণাটা সম্পুর্ণই ভুল।

পিরিয়ড় শুরু হওয়া কোনো মেয়ের শারীরিক এবং মানসিক পরিপক্বতার ‘শুরু’ মাত্র, পরিপক্বতা নয়। আর নাবালিকা থেকে সাবালিকা হওয়ার মাঝখানের যে জার্নিটা সেটাই হল বয়:সন্ধিকাল। বয়:সন্ধি পার করে সাবালিকা হওয়া একটা লংটার্ম প্রসেস। যার সময়কাল ১৩ থেকে ১৮।

সাবালিকা হওয়ার আগেই যখন আপনি কোনো মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন, তখন মেয়েটির স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং বিকাশ উভয়ই ব্যহত হয়। শুরুতেই বলেছি, আঠেরোর আগে কোনো মানুষই নিয়মিত শারীরিক সম্পর্কে জড়ানোর সক্ষমতা লাভ করে না। এখন বিয়ের মত একটি সামাজিক প্রথার মাধ্যমে আপনি যখন কোনো কিশোরীকে এই সম্পর্কের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, তখন বায়োলজিক্যাল যে প্রসেসটিতে ব্যাঘাত ঘটে তা হচ্ছে:

বয়:সন্ধিতে যে হরমোনগুলো শারীরিক বৃদ্ধির জন্য ভূমিকা রাখে অর্থাৎ, মানুষের শরীরের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ‘কঙ্কাল’, মানে হাড়ের বৃদ্ধি, বিকাশ এবং হাড়কে সুগঠিত করার মতো কাজগুলো করতে থাকে। এ সময় কেউ নিয়মিত শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে শরীর গঠনের মত এই অতীব প্রয়োজনীয় কাজটি বন্ধ করে হরমোনগুলো ছেলে/মেয়েটিকে সেক্সুয়্যালি ম্যাচিউর করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। থেমে যায় উচ্চতা বৃদ্ধি, জয়েন্ট এবং পেলভিক (প্রজননতন্ত্রের) এরিয়ার সুগঠিত হওয়া। সেই সাথে ব্যহত হয় মানসিক বিকাশ।

বাল্য বিয়ের ভিক্টিম মেয়েরা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে অকালমৃত্যুর শিকার হয়েছে কিংবা ইমম্যাচিউর বেবী জন্ম দিয়েছে- এই ঘটনা কারো অজানা থাকার কথা নয়। হরহামেশাই হচ্ছে। তাছাড়া আরও যে ব্যাপারটা আমাদের দৃষ্টির অগোচরে থেকে যাচ্ছে, তা হলো অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া মেয়েরা ৩০ বছর পার করার পর পরই হাঁটু ব্যাথা, কোমড় ব্যাথার মতো হাড় সংক্রান্ত রোগে ভুগতে শুরু করে। বায়োলজিক্যালি যেটা হওয়ার কথা পিরিয়ড় বন্ধ হবার পর, অর্থাৎ ৪৫এর পরে। বেশিদূর যেতে হবে না, আমরা আমাদের ষষ্ঠ/সপ্তম শ্রেণীতে বিয়ে হওয়া মায়েদের দিকে তাকালেই উপলব্ধি করতে পারবো। এরকম আরও হাজারটি কারণ লেখা যায়, যার জন্য বাল্য বিয়েকে ‘না’ বলতে বাধ্য আপনি।

২) বাহ্যিক শারীরিক পরিপক্কতা কি বিয়ের যোগ্যতার মানদন্ড হতে পারে?

উত্তর হচ্ছে, না। বাহ্যিকভাবে কাউকে স্যেক্সুয়্যালি ম্যাচিউর মনে হলেই সে শারীরিক সম্পর্কের জন্য প্রস্তুত এমন ভাবার সুযোগ যে নেই, তার উত্তর আমরা অনেকটাই জেনে গেছি প্রথম পয়েন্টে। জেনেটিক কিংবা হরমোন সিক্রিশনের উপর ভিত্তি করে কারো বৃদ্ধি কিছুটা দ্রুত হতে পারে। তারমানেই এই না যে, বয়:সন্ধির অন্য ফাংশন আর ডিমান্ডগুলোও ফুলফিল হয়ে গেছে। বয়:সন্ধি হচ্ছে একজন মানুষকে প্রস্তুত করার সেই জটিল প্রসেস, যা শারীরিক এবং মানসিক স্থিতির জন্য অপরিহার্য। দ্রুত ফিজিক্যাল গ্রোথের আরও একটি কারণ হতে পারে হরমোনাল ডিসঅর্ডার। আবার শারীরিক বৃদ্ধি মানেই যথেষ্ট মানসিক বিকাশ হয়ে গেছে, এমনটা ভাবারও কোনো সুযোগ নেই।

লেখাটির পরের অংশে থাকবে বাল্যবিয়ের সামাজিক বৈধতা, প্রেক্ষাপট, বাল্যবিয়ে এড়ানোর কৌশল এবং সর্বোপরি যে কোনো সিচুয়েশন, আই রিপিট- যে কোন সিচুয়েশনে বাল্যবিয়েকে ‘না’ বলার যৌক্তিকতা ও মানুষ হিসেবে আমাদের দায়বদ্ধতা নিয়ে। আশাকরি, বিয়ের বয়স নিয়ে আপনাদের ভ্রান্তি কিছুটা হলেও দূর করতে পারবো।

Comments

comments

Visitor counter

Visits since 2018

Your IP: 35.173.57.84

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯