প্রচ্ছদ জাতীয়, জেলা সংবাদ, সাক্ষাতকার, স্লাইডার

মায়ের জায়গা গোয়াল ঘরে, বাঁধা হয় গরুর দড়ি দিয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯ | পড়া হয়েছে 129 বার

মায়ের জায়গা গোয়াল ঘরে, বাঁধা হয় গরুর দড়ি দিয়ে

ছেলেরা তাকে গোয়ালঘরে রাখলেও খবিরুন্নেসা বারবারই বলছিলেন, ‘আমার পোলারা আপনাগো দোয়ায় মোরে ঠিকমত খাওন দাওন দেয়। হ্যারা অনেক ভালো’

গর্ভে ধারণ করে পরম যত্ন্রে লালন পালন করলেও বৃদ্ধ বয়সে সেই মায়েরই ঠিকানা হয়েছে গোয়াল ঘরে। এমনকি মানসিক রোগী আখ্যা দিয়ে কোমরে শিকল দিয়ে বেঁধেও রেখেছেন ছেলেরা। এ ঘটনা ঘটেছে বরগুনা সদর উপজেলার গৌরিচন্না ইউনিয়নের চরধুপতি এলাকায়।

খবর পেয়ে বরগুনা জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোস্তাইন বিল্লাহর নির্দেশে বৃদ্ধা ওই মাকে উদ্ধার করে তার মেয়ের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেশিরা জানান, গত পাঁচ মাস ধরে মা খবিরুন্নেসাকে (৭৫) গোয়াল ঘরে বিছনা পেতে গরু বাঁধার দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। একদিন দড়ি খুলে তিনি মেয়ের বাড়িতে যাওয়ার পথে ফের তাকে ছেলেরা ধরে আনেন। পরে একই স্থানে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। শেকল বাঁধা অবস্থায় প্রায় পাঁচ মাস ধরে তিনি গোয়াল ঘরেই জীবনযাপন করছেন।

বয়সের ভারে কানে একটু কম শুনলেও খবিরুন্নেসা মানসিকভাবে স্বাভাবিক বলে জানান প্রতিবেশিরা। তারা বলেন, মূলত পৈত্রিক জমি-জমা ভাগ বাটোয়ারা হওয়ায় পরে ছেলেদের কেউ বৃদ্ধা মায়ের যত্ন নিতে রাজি নন। এ কারণে তাকে অবহেলায় গোয়াল ঘরে ফেলে রাখা হয়েছে। কোথাও যেন যেতে না পারেন সে কারণে কোমরে লোহার শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। ওই গোয়াল ঘরেই দিনে একবার তাকে খাবার দেওয়া হয়।

প্রতিবেশী হুমায়ুন কবীর জানান, খবিরুন্নেসা দুই ছেলে ও তিন মেয়ের জননী। দুই বছর আগে স্বামী আবদুল হামিদ খান মারা যাওয়ার পর সহায় সম্পত্তি ছেলে-মেয়েরা ভাগ করে নেন। মা খবিরুন্নেসার ভরণপোষণ নিয়ে ছেলেদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে এক বৈঠকে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সহায়তায় দুই ছেলে মিলে ভরণপোষণ করবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু ছেলেদের কেউই ঠিকমতো মায়ের যত্ন নেননি। এছাড়াও রোগে খবিরুন্নেসার শারীরিক অবস্থারও অবনতি হতে থাকে।

সোমবার (১৪ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে ওই বাড়িতে গিয়ে বৃদ্ধা খবিরুন্নেসাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি গোয়াল ঘরে বিছানায় শেকল বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়। সেখানে বসে তিনি নাতী-নাতনীদের ডাকছিলেন। শেকলে বাঁধা থাকায় তিনি বিছানা ছেড়ে নামতেও পারছিলেন না। এমনকি মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা পেতে মশারিরও কোনো ব্যবস্থা নেই সেখানে।

এসময় গোয়ালঘরে লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে খবিরুন্নেসা পরিচয় জানতে চান। ছেলেদের ব্যপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপনারা কারা বাবা? মোর পোলারা ভালো। হ্যারা মোরো ঠিকমত খাওন-দাওন দেয়। মোর পোলাগো যেন কেনো সমস্যা না অয় বাবা।”

নানাভাবে জানতে চাইলেও ছেলেদের নিয়ে কোনো অভিযোগ করেননি ওই বৃদ্ধা মা।

খবিরুন্নেসা বারবারই বলছিলেন, “আমার পোলারা আপনাগো দোয়ায় মোরে ঠিকমত খাওন দাওন দেয়। হ্যারা অনেক ভালো।”

খবিরুন্নেসার ছোট ছেলে বাচ্চুকে এসময় ঘরে পাওয়া যায়। বাচ্চু জানান, তিনি মায়ের ঠিকমতই ভরণপোষণ করছেন।

গোয়াল ঘরে কেন রাখলেন-জানতে চাইলে বাচ্চু বলেন, “মায়ের মাথায় সমস্যা। আমি বাইরে কাজে ব্যস্ত থাকি। মা কোথায় কখন চলে যায় তাই বেঁধে রেখেছি।”

এ বিষয়ে বড় ছেলে বাদলের স্ত্রী বেবি বলেন, তার শাশুড়ি মানসিক রোগী। সে কারণে তাকে ছেলেরা বেঁধে রেখেছেন।

প্রতিবেশীরা জানান, খবর পেয়ে মঙ্গলবার (১৫ অক্টোবর) সকালে বরগুনা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেট ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ওই বাড়িতে গিয়ে বৃদ্ধাকে উদ্ধার করেন। এসময় তাকে পোশাক ও টাকা দিয়ে মেয়ে তাসলিমার জিম্মায় দেওয়া হয়।

গৌরিচন্না ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তানভীর হোসেন বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে বৃদ্ধা খবিরুন্নেসাকে যথাসাধ্য সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়াও তার ভরণপোষণ যাতে নিশ্চিত করা হয় সে বিষয়ে ছেলেদের ডেকে তিনি ব্যবস্থা নেবেন। এসময় চেয়ারম্যান ওই বৃদ্ধাকে ২ হাজার টাকা দেন।

জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেট জাকির হোসেন বলেন, “বিষয়টি চরম অমানবিক। এটি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ছাড়া কিছু না। আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে উদ্ধার করে মেয়ে তাসলিমার জিম্মায় দিয়ে ছেলেদের ভরণপোষণ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছি। এর ব্যত্যয় ঘটলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বরগুনার ডিসি) মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নজরে আসার সাথে সাথে সেখানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে বৃদ্ধা মাকে উদ্ধার করা হয়েছে। সেই সাথে বৃদ্ধা মাকে নতুন বস্ত্র ও নগদ অর্থ প্রদান করে তার মেয়ের জিম্মায় রাখা হয়েছে।”

পুনরায় ছেলেরা যাতে তাদের মায়ের সঙ্গে এধরনের আচরণ না করতে পারে তার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান ডিসি। তিনি আরো বলেন, “বিষয়টি অমানবিক। আমরা বরগুনা জেলা প্রশাসন বৃদ্ধা মায়ের পাশে আছি। সেই সাথে বৃদ্ধা মাকে যাতে তার ছেলেরা আর অবহেলা না করতে পারে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।”

Comments

comments

Visitor counter

Visits since 2018

Your IP: 18.205.176.85

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০