প্রচ্ছদ জাতীয়, পরিবেশ, বিচিত্র নিউজ, বিবিধ, শিরোনাম, সাক্ষাতকার, স্লাইডার

পুরুষের জন্যও নারীবাদ

শারমিন শামস্ (সমাজকর্মী শারমিন একজন ফিল্মমেকার ও সাংবাদিক) | সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | পড়া হয়েছে 124 বার

পুরুষের জন্যও নারীবাদ

লেখক:- শারমিন শামস্ (সমাজকর্মী শারমিন একজন ফিল্মমেকার ও সাংবাদিক):

আমি একজন পুরুষ শিল্পীকে চিনি, যার ইচ্ছে করে সারাদিন বসে ছবি আঁকবেন। আরেকজন পুরুষকে চিনি যিনি চান গান নিয়েই থাকতে। কিন্তু সেইটা তিনি করতে পারেন না। কারণ তারে নয়টা পাঁচটা অফিস করতে হয়। নানা রকম ধান্ধা করতে হয়। কারণ সংসার চালানোর মূল দায় তার, পুরুষের। তারা তাদের সংসারের মূল উপার্জনকারী।

পিতৃতন্ত্র ঠিক করে দেয় কার দায় কোনটা। অর্থ উপার্জন, প্রডাকশনের দায় পুরুষের। নারীর দায় গৃহকর্মের, সন্তান লালনের, সেবার। এখন সেটা কেনো পিতৃতন্ত্র ঠিক করে দেয়? কে কোন কাজে ভাল সেটি তো জেন্ডার দ্বারা মাপা যায় না। বহু বহু পুরুষ গৃহকর্ম ভালোবাসে, সন্তান লালনে আনন্দ পায়। আবার বহু বহু নারী কৃষিকাজ ভালোবাসে, কলকারখানার কাজ পছন্দ করে। অথচ পিতৃতন্ত্রের ঠিক করে দেয়া ডিভিশন অব ওয়ার্ক আপনাকে মেনে চলতে হয়। আপনি বন্দি।

নারীবাদ নিয়া নারীই বেশি কথা বলে। অথচ পুরুষের জীবনে নারীবাদ একই মাত্রায় জরুরি ও উপকারী। আফসোস, এদেশের পুরুষেরা এখনো ভেবে বসে আছে, পিতৃতন্ত্র তাদের উপকারে লাগছে। অথচ পিতৃতন্ত্র তাদের একইভাবে শোষণ করছে, যেভাবে নারীকে করে।

নারীবাদ নিয়া আরো গভীর আলোচনায় যাবো, সেই সুযোগই তৈরি হয় না। বেশিরভাগ লোক ধরেই রেখেছে, নারীবাদ হইলো পুরুষতন্ত্রের বিপরীত একটা জিনিস। মানে নারীবাদ ওদের কাছে নারীর শাসন আর পুরুষের শোষিত হওয়া। চিন্তার জায়গা এতই প্রিলিমিনারি পর্যায়ে আটকায়ে আছে যে, সেই জট আর কিছুতেই ছুটতেসে না। ফলে আলোচনা সামনে আগানোই বিরাট পরিশ্রমের কাজ হয়ে যায়।

এরা আলাপ করে এই টোনে- ‘আমি নারীবাদ পুরুষবাদ বুঝি না। আমি বুঝি মানবতাবাদ/ মানববাদ…ব্লা ব্লা ব্লা!’ ‘নারীবাদ পুরুষতন্ত্র দুইটাই খারাপ। এর কোনটাই ঠিক না ব্লা ব্লা ব্লা’।

নারী পুরুষ উভয়রেই এইসব বলতে দেখি। অথচ নারীবাদ বা ফেমিনিজম লিখ্যা গুগলে একটা সার্চ মারলেও মাত্র দুই সেকেন্ডে ফেমিনিজমের মানে উদ্ধার করা যায়। ইতিহাস মিতিহাস ওয়েভ ময়েভ তো পরের কথা। এগুলা না পড়েন নাই পড়েন, অ্যাট লিস্ট ফেমিনিজম, জেন্ডার, সেক্সিজম, সেক্সিস্ট- এই শব্দগুলার অন্তত মানে শেখেন। একটু মাথা ঘামাইলেই হয়। মাত্র দশ মিনিটের মামলা কিন্তু।

তো কইতেসিলাম, পুরুষতন্ত্র কিন্তু পুরুষরে আসলে ভালো রাখে না। ভালো রাখে না বলেই আপনাদের কান্ধে রাজ্যের ভার তুইলা দেয়। আপনাদের স্বপ্নগুলারে খুন করে। বুকের ভেতরে যে নরম কোমল সুন্দর অনুভূতিগুলা আছে, সেইগুলারে পিষে মারতে শিখায়। কাঁদতে দেয় না। মন খুলে হাসতেও দেয় না। পুরুষতন্ত্র একটা নারীরে যেমনে নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক একইরকম মাত্রায় পুরুষরে করে। শুধু পদ্ধতি আলাদা, ক্ষেত্র আলাদা। পিতৃতন্ত্র নারীরে ঘরে ঠ্যালে আর নিয়ন্ত্রণ করে। আর পুরুষরে বাইরে ঠেলে আর নিয়ন্ত্রণ করে। দুই ক্ষেত্রেই দুইটা জেন্ডার পিতৃতন্ত্রের হাতে ঝুলানো রশির ডগায় ঝুলতেসে।

দুনিয়াজোড়া করে খাচ্ছে যে পুঁজিবাদ, আপনি তার হাতের পুতুল মাত্র। আর পিতৃতন্ত্র আপনার সেই পুঁজিবাদ ভাইয়ার সহমত ভাই। তার উইপন। তার অস্ত্র। কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে ভাইস ভার্সা।

নাইজেরিয়ান ফেমিনিস্ট লেখক, কথক chimamanda ngozi adichie নিজের কথা বলতে গিয়া বলতেসেন, ছোটকালে একবার তার টিচার ক্লাসে এসে বললেন, একটা ছোট টেস্ট হবে। টেস্টে যে ফার্স্ট হবে, সেই হবে ক্লাস ক্যাপ্টেন। তো আদিচি ভীষন উৎসাহী ছিলেন ক্যাপ্টেন হতে। যথারীতি পরীক্ষা হলো। আদিচি ফার্স্ট হলেন। কিন্তু টিচার (আগে বলতে ভুলে গেসিলেন) জানাইলেন, কোনো মেয়ে ক্যাপ্টেন হতে পারবে না। ফলে সেকেন্ড হয়েছে যে ছেলেটি, তাকে ক্যাপ্টেন করা হলো। অথচ ছেলেটার এই ক্যাপ্টেনশিপের ব্যাপারে একটুও আগ্রহ ছিলো না। সে এসব পছন্দই করতো না। অথচ জোর করে তাকেই ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব দেয়া হলো।

পিতৃতন্ত্রের খবরদারির খুব ছোট্ট অথচ গুরুত্বপূর্ণ একটা উদাহরণ। আমি প্রত্যাশা করি, আমাদের পুরুষেরা নিজের ব্যাক্তিগত জীবনে পিতৃতন্ত্রের এই খবরদারি আর প্রভাব নিয়ে একটু ভাবার অবকাশ পাবেন।

Comments

comments

Visitor counter

Visits since 2018

Your IP: 18.205.176.85

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০